শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে রয়েছেন তারেক আনোয়ার জাহেদী। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি পিআরএলে যাবেন। তখন গুরুত্বপূর্ণ এ পদটি শূন্য হবে। গোপালগঞ্জে পাঁচ বছর চাকরি করাসহয় নানান বিতর্কে তার আগেই এ পদ থেকে তারেক আনোয়ার জাহেদীকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে শিক্ষাপ্রশাসনে চলছে জোর আলোচনা।
ফলে শূন্য হতে যাওয়া শিক্ষা প্রকৌশলের শীর্ষ পদটি দখলে মরিয়া অধিদপ্তরের কয়েকজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। এরই মধ্যে তারা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। পাশাপাশি এ পদে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এতে শিক্ষাপ্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে অস্থিরতা বিরাজ করছে।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধান প্রকৌশলী পদ পেতে আলোচনায় থাকা চারজন কর্মকর্তার মধ্যে অন্যতম মো. জাহেদুল করীম। তিনি বর্তমানে রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব)।
প্রধান প্রকৌশলী পদ পাওয়ার দৌড়ে তার চেয়েও এগিয়ে থাকা একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। একজনকে ওএসডি করা হয়। এ নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভ্রান্তিকর এসব তথ্য ছড়ানো এবং অন্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনার নেপথ্যে জাহেদুল করীমসহ কয়েকজন কর্মকর্তার হাত রয়েছে। তারা নানাভাবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে অস্থিরতা ছড়িয়ে ফায়দা লুটতে চাইছেন।
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ‘দাপুটে’ নেতা জাহেদুল
প্রধান প্রকৌশলী পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ করা জাহেদুল করীম বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা। ২০২২ সালের ২৭ জুলাই গঠিত বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটিতে জাহেদুল করীম ছিলেন কার্যনির্বাহী সদস্য। সেসময় তিনি ঢাকা জেলা শিক্ষা প্রকৌশলের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন।
জানা যায়, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অনুমোদনপ্রাপ্ত। আওয়ামী লীগ আমলে এ পদ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ পদে যারা থাকতেন, তারা ক্ষমতাধর ও সুবিধাভোগী ছিলেন।
শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের শিক্ষা প্রকৌশল শাখার সবশেষ আহ্বায়ক কমিটিতেও জাহেদুল করীম সদস্যসচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ২০২৩ সালের ২ আগস্ট এ কমিটি দেওয়া হয়। এ সংক্রান্ত নথিপত্র নতুন দিগন্তের হাতে রয়েছে।
নিয়ম ভেঙে জাহেদুল করীমের পদোন্নতি
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর পাঁচজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে পদোন্নতি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করা হয়। পদোন্নতির ওই আদেশে পাঁচ নম্বরে ছিলেন জাহেদুল করীম। পদোন্নতির পর তাকে রংপুর সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইইডি সূত্র জানায়, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর মোট পদ ১২টি। ৯টি সার্কেলে ৯ জন এবং প্রধান কার্যালয়ের তিনটি অধিশাখায় তিনটি পদ রয়েছে। সেসময় পদ ফাঁকা না থাকলেও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে মো. জাহেদুল করীমসহ তিনজনকে পদায়ন করা হয়।
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা হওয়া সত্বেও গণঅভ্যুত্থানের পর তাকে পদোন্নতি দেওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে, কোটি টাকার অবৈধ সুবিধা নিয়ে জাহেদুলসহ কয়েকজনকে নিয়ম-বহির্ভূত পদায়ন দেওয়া হয়েছে। তখন এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়।
অনিয়ম-দুর্নীতিতে পটু জাহেদুল
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা হওয়ায় আওয়ামী লীগ আমলে দাপুটে কর্মকর্তা ছিলেন। সেসময় বিভিন্ন ঠিকাদারকে দরপত্রের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দেওয়া, অগ্রিম বিল পরিশোধ, কাজ শেষের আগেই বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি সম্পূর্ণ বিধি-বহির্ভূতভাবে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরেরই এক হিসাব সহকারীর মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাঈদ এন্টারপ্রাইজকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন জাহেদুল করিম।
জাহেদুল করীমের সঙ্গে যোগসাজশ করে কাজ বাগিয়ে নেওয়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের ওই হিসাব সহকারীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাঈদ এন্টারপ্রাইজ শুধুমাত্র ২০২৪-২০২৫ সালে ১১টি বিলে দুই কোটি ৮০ লাখ ৫৫ হাজার ৭৬০ টাকা তুলেছেন। এ টাকার বড় অংশেরই ভাগ জাহেদুল করীমের পকেটে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ বিষয়ে যা বললেন জাহেদুল করীম
জানতে চাইলে জাহেদুল করীম বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগ করতাম, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের নেতা ছিলাম; এটা সত্য। কিন্তু টেন্ডারে অনিয়ম-দুর্নীতি করিনি। আমার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ সত্য নয়।’
সাঈদ এন্টারপ্রাইজকে কাজ ও বিল তুলতে সহায়তার অভিযোগ প্রসঙ্গে করা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সাঈদ এন্টার প্রাইজকে কাজ আমি দিইনি। কাজ অন্যরা দিয়েছে। হয়তো আমি বিল ছেড়েছি। কাজ ভালো হওয়ায় বিল আটকানোর সুযোগটা ছিল না।’
প্রধান প্রকৌশলী পদে বসতে তদবিরের বিষয়ে জাহেদুল করীম বলেন, ‘যেহেতু আমি বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের সদস্য, সেজন্য আমাকে এ পদে দেওয়া হবে না। আমি প্রত্যাশাও করছি না। তাছাড়া আমার ওপরে সিনিয়র ১১ জন আছেন।’
শিক্ষা প্রকৌশলে অস্থিরতা চলতে দেওয়া হবে না: সচিব
জানতে চাইলে শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক বলেন, ‘শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। সেখানে কোনো ধরনের অস্থিরতা চলতে দেওয়া হবে না। কর্মকর্তারা কেউ যদি নিজের কাজ ফেলে তদবিরবাজি করে বেড়ান, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
প্রধান প্রকৌশলী পদ ঘিরে আওয়ামী লীগপন্থি কর্মকর্তাদের দৌড়ঝাঁপ প্রসঙ্গে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ ধরনে সুযোগ নেই। যারা ফ্যাসিস্ট আমলে সুবিধাভোগী ছিলেন, তাদেরকে নতুন করে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে না।’